ফ্যাবিও ক্যানাভারো: বলবয় থেকে ব্যালন ডি’অর!

0

আজকাল কেউ ইটালিয়ান ফুটবলের ব্যাপারে বললে সবার মাথায় প্রথমেই আসে ইটালিয়ান ডিফেন্সের কথা। এখনকার ছেলেরা কিয়েলিনি কিংবা বনুচ্চির মতো হতে চায়। কিন্তু আপনাদেরকে একটা কথা বলি, আমি কখনো ডিফেন্ডার হতে চাইনি। ১৯৮২ এর বিশ্বকাপে পাওলো রসির সেই ছয় গোল দেখার পর কে চাইবে ডিফেন্স লাইন সামলাতে?

ফাইনালে ডি-বক্সের বাইরে থেকে মিডফিল্ডার মার্কো তারদেল্লির গোলটা এখনো আমার চোখে লেগে আছে। গোলের পর তাঁর বুনো উল্লাসটাও মনে আছে। দুই পাশে দুই হাত ছড়িয়ে চিৎকার করতে করতে পুরো মাঠ ঘুরেছিলো তারদেল্লি। ইটালির অন্য সব বাচ্চা ছেলের মতো আমিও মাত্র নয় বছর বয়সে টিভিতে বসে ফাইনালটা দেখছিলাম। যখন ফাইনালের শেষ বাঁশিটা বাজলো – যখন ইটালি চ্যাম্পিয়ন হলো, তখন টিভি কমেন্ট্রি থেকে ভেসে আসছিলো নান্দো মারতেল্লিনির চিৎকার- “Campioni del mondo! Campioni del mondo! Campioni del mondo!” আমার মনে হয় না সেদিন মারতেল্লিনির সেই চিৎকার শোনার পর ইটালির কোনো ছেলে ফুটবলে একটা হলেও কিক না মেরে থাকতে পেরেছে।

যখন আমি প্রথম নাপোলিতে যাই, তখন আমি একজন বল-বয় ছিলাম। আমি নাপোলির গ্রেটদেরকে ট্রেনিং করতে দেখতে পেতাম! এরপর যুবক বয়সে আমি তারদেল্লির মতো একজন মিডফিল্ডার হিসেবে নাপোলির যুব দলে যোগ দেই। তারপর একদিন ক্লাবের একজন ডিরেক্টর একাডেমীতে আমার খেলা দেখতে এসে আমাকে বললেন তারা আমার পজিশন পরিবর্তন করাতে চাচ্ছেন। ক্লাব ডিরেক্টর সেদিন আমাকে বলেছিলেন, “ফ্যাবিও, আমি চাই তুমি একজন ডিফেন্ডার হও।” সে শুধু এতোটুকুই বলেছিলো। কোনো ব্যাখা কিংবা কারণ দেখায়নি।

মাঠে অনেক ছেলেদের চেয়ে আমার উচ্চতা ছিলো অনেক কম। আমাকে একদমই টিপিক্যাল ডিফেন্ডারদের মতো দেখাতো না, সেন্টার-ব্যাক হিসেবে তো নয়ই। কিন্তু সেদিন থেকে সেন্টার-ব্যাকই হয়ে গেলো আমার পজিশন। আমার জন্য ভালোই হলো, কারণ আমি ডিফেন্সে খেলতে ভালোবাসতাম। আর ডিফেন্ড করাটা বেশ ভালোই পারতাম আমি। পেছনের দিকে ফিরে তাকালে মনে হয়, আমার ক্যারিয়ারে আমি দুটি জিনিসের প্রতি কৃতজ্ঞ। প্রথমত, আমি বিশ্বসেরাদের খেলা দেখে শিখেছি। যখন আমি নাপোলিতে যাই তখন আমি সিরো ফেরারার সাথে খেলেছি, যে কি-না নাপোলি আর জুভেন্টাসের হয়ে পাঁচশোরও বেশি ম্যাচ খেলেছেন এবং তিনি ইটালিয়ান ফুটবলের একজন কিংবদন্তি। অন্য সব ইটালিয়ানদের মতো ফেরারা খুব বেশি কথা বলতো না। সে শুধু আপনাকে বলবে খেলার সময় মাঠে কোথায় থাকতে হবে এবং কোথায় থাকাটা প্রয়োজন।

ফেরারার সাথে আমার পরিচয় ১৯৮৭ সালে, নাপোলিতে আমার বল-বয় থাকাকালীন সময়কালে। সেবার যখন নাপোলি প্রথম সিরি আ টাইটেল জিতলো আমি প্লেয়ারদের সাথে মাঠে ছিলাম। সেটা একটা অসাধারণ সিজন ছিলো। আমি সবার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখছিলাম, কিন্তু একজন ছিলেন একেবারে বিশেষ কেউ। দ্যা জিনিয়াস! ডিয়েগো ম্যারাডোনা!

প্রত্যেকদিন আমি ম্যারাডোনার খেলা দেখতাম। প্রথম যেবার আমি মূল দলের সাথে ট্রেনিং করার সুযোগ পেলাম তখন আমি ফেরারাকে বলেছিলাম, “শেষমেশ আমি ম্যারাডোনার সাথে ট্রেনিং করতে পারবো!” ফেরারা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলেছিলো, “না না, তুমি শুধু ম্যারাডোনার সাথে ট্রেনিং করতে যাচ্ছো না। তুমি যাচ্ছো ম্যারাডোনাকে ট্যাকেল করতে। তাঁর পা থেকে বল নেয়া দুঃসাধ্য।”

তারপর সে আমার দিকে একটা বল ছুঁড়ে মারলো। মজা করে বললো, “এই বলটা নাও, কারণ তুমি ম্যারাডোনাকে ট্যাকল করে বল নিতে পারবে না, তাই আপাতত আমাকেই ট্যাকেল করো।” অবশেষে আমি ফেরারা সহ ফার্স্ট টিমের সবার সাথে ট্রেনিং করার সুযোগ পেলাম, এবং অবশ্যই আমার আদর্শ ম্যারাডোনার সাথে।

একদিন পায়ে বল নিয়ে ম্যারাডোনা আমার দিকে এগিয়ে আসছিলেন। প্রত্যেকটা ড্রিবলের সাথে বলটা যেনো শূন্যে ভাসছিলো। কি মনে করে যেনো আমি বলটার দিকে এগিয়ে গেলাম। আমি ম্যারাডোনাকে ট্যাকেল করলাম! দ্যা জিনিয়াস! দ্যা লিজেন্ড! হঠাৎ দেখলাম আশেপাশে আমার সব টিমমেট আর ট্রেইনার আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। আমার মাথায় হঠাৎ করে বাজলো ফেরারার সেই কথাটা – “তুমি ম্যারাডোনাকে ট্যাকেল করতে পারবে না। তাঁর থেকে বল নেয়া দুঃসাধ্য ব্যাপার।” ট্যাকেলটার পর সেইসময় একমাত্র ম্যারাডোনাই আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিলেন। ট্রেনিং শেষে ম্যারাডোনা আমার কাছে এসে তাঁর একজোড়া বুট আমাকে উপহার দিলেন।

আমার বেডরুমের সমস্ত ওয়ালজুড়ে ম্যারাডোনার পোস্টার লাগানো ছিলো – তিনি ছিলেন আমাদের নেপলসের ঈশ্বর! আর সেই ম্যারাডোনার বুটজোড়াই আমার হাতে এখন! আর দ্বিতীয়ত যে জিনিসটা আমি শিখেছি সেটা হলো- একজন গ্রেট ডিফেন্ডার হতে চাইলে আপনাকে গ্রেটেস্ট সব ফুটবলারদের বিপক্ষে খেলতে হবে। আর কোন গুণটা থাকা লাগবে? না, উচ্চতা, গতি কিংবা বল স্কিল নয়। আপনার মধ্যে অবশ্যই আত্মবিশ্বাস থাকা লাগবে। আমি জানিনা এই আত্মবিশ্বাসের ব্যাপারটি আমি কিভাবে পেয়েছি – তবে প্রথম আমি যেদিন ম্যারাডোনাকে ট্যাকেল করেছিলাম সেদিন থেকেই আত্মবিশ্বাসটা আমার ভেতরেই ছিলো। তারপর ক্যারিয়ারের বাকি সময়টুকুতে আমি নিজের আত্মবিশ্বাসটাকে শুধু বাড়িয়েই তুলেছি।

নাপোলি, পার্মা, ইন্টার আর জুভেন্টাসে হয়েছি আরো পরিণত। সত্যি কথা বলতে কি, ৯ই জুলাই, ২০০৬ এর আগ পর্যন্ত ডিফেন্ডার হিসেবে পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসটা আমি অনুভব করিনি। যেদিন আমি বিশ্বকাপ ট্রফিটাকে উঁচিয়ে ধরেছিলাম আর রিপোর্টাররা আমাদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলছিলোঃ “Campioni del mondo! Campioni del mondo! Campioni del mondo! Campioni del mondo!” ডিফেন্ডার হিসেবে আপনার দৈহিক আকৃতি নানারকম হতে পারে। আপনি খাটো হতে পারেন কিংবা গতিশীল হতে পারেন। অথবা আপনি অনেক লম্বা হতে পারেন। কিন্তু এগুলো আসলে কোনো প্রভাব ফেলে না। দিনশেষে আপনি মাঠে ডিফেন্ডার হিসেবে কতটুকু আত্মবিশ্বাসী সেটাই আসল, কারণ আপনাকে প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। নতুন সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেই আপনি আপনার আত্মবিশ্বাসটাকে ঝালিয়ে নিতে পারবেন।

ম্যারাডোনাকে সেই প্রথমদিন ট্যাকেল করার পর থেকে এই আত্মবিশ্বাসটার সূচনা হয়েছে আমার আমার মধ্যে, যেটাকে আমি প্রতিনিয়ত লালন করেছি। এমনকি আজকের দিনেও আমি মাঠের পাশে সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে একজন ম্যানেজার হিসেবে আত্মবিশ্বাসটুকু অনুভব করি। আমার জীবনের সফল মুহূর্তগুলোর কথা না বলে আসুন আপনাদেরকে শোনাই সেইসব মানুষ, সেইসব টিমমেট কিংবা প্রতিপক্ষের কথা যারা কি-না সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন আমাকে। তাঁদের কারণেই আমি নিজের মধ্যেকার আত্মবিশ্বাসটুকু গড়ে তুলতে পেরেছি।

তাঁর আগে এবং তাঁর পরে আমি যতজনের মুখোমুখি হয়েছি তাঁদের মধ্যে আমার ভেতর সবচেয়ে বেশি ভীতির সঞ্চার করেছিলেন রোনালদো! তিনি ছিলেন আমাদের প্রজন্মের সেরা খেলোয়াড়। দ্যা ফেনোমেনন! দ্যা রোনালদো! ১৯৯৮ বিশ্বকাপের আগে আগে ফ্রান্সে ইটালি বনাম ব্রাজিলের এক প্রীতি ম্যাচে আমি প্রথম রোনালদোর মুখোমুখি হই। এমনকি সেদিন তাঁর সাথে একই মাঠে খেলতে গিয়েও আমি ভয় পাচ্ছিলাম। আমরা ম্যাচটা ৩-৩ গোলে ড্র করেছিলাম। খেলা শেষে আমাদের কোচ সিজার মালদিনির সাথে আমার কিছু কথা হয়েছিলো। “ফ্যাবিও তুমি জানো যে রোনালদো কতোটা অবিশ্বাস্য! আজকে তাঁর বিরুদ্ধে তোমার খেলা দেখে বুঝলাম সে কতোটা ভালো খেলোয়াড়!” আমি শুধু বললাম, “থ্যাঙ্কস কোচ!” রোনালদো হলেন এমন একজন প্লেয়ার যাকে আপনি ডিফেন্ড করতে পারবেন না, যতটুকু পারবেন তা হলো তাঁর লিমিটটাকে কমিয়ে আনা। কারণ রোনালদো যদি গোল করতে চাইতেন তাহলে তিনি সেটা করে দেখাতেন। অবশ্যই ব্রাজিলে রোমারিও, রবার্তো কার্লোস, রোনালদিনহোর মতো খেলোয়াড় ছিলো। কিন্তু রোনালদো? তাঁর ব্যাপারে আর কি বলবো, তিনি ছিলেন একেবারেই আলাদা। তিনি ছিলেন দ্রুত। তিনি ছিলেন শক্তিশালী। তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্য! যতবারই আমি তাঁর বিরুদ্ধে খেলেছি ততবারই নিজের মধ্যে থেকে তাঁর জন্য অগাধ শ্রদ্ধা বের হয়ে এসেছে। তিনি ছিলেন এমন একজন খেলোয়াড় যাকে সংবাদপত্রের হেডলাইনে থাকার জন্য উল্টা-পাল্টা কথা বলতে হতো না। আপনি কখনোই বুঝতে পারবেন না খেলার সময় তাঁর মাথার মধ্যে কি চলছে। বরং খেলা শুরু হওয়ার কয়েক ঘন্টা আগে দেখবেন তিনি আপনার মাথার ভেতর ঢুকে বসে আছেন।

তাঁর বিরুদ্ধে খেলার সময়ের সেই ভয়টা এখনো আমার মধ্যে থেকে যায়নি। এই ভয়ের কারণেই জন্ম নিয়েছে তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা। রোনালদোর প্রতি এই শ্রদ্ধাবোধই আমাকে পরে আরো পরিণত করতে সাহায্য করেছে। আপনি যখন খেলতে নামবেন তখন অবশ্যই খেলাটা এবং প্রতিপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে। রোনালদোর মাধ্যমেই আমি শিখেছি কিভাবে মাঠে নিজের ভয়টাকে কমানো করা যায়।

ফুটবল মাঠের টাফনেসের কথা বললে যদি রোনালদোর নাম আসে তাহলে শিল্পের কথা বললে নাম আসবে জিদানের। তিনি ছিলেন মাঠের পুরোদস্তুর একজন জেন্টেলম্যান। আমি নিশ্চিত খুব কম সময়ই তিনি মাটিতে পা রেখে খেলেছেন, বেশিরভাগ সময়ই মনে হতো তিনি বাতাসে ভাসছেন। তাঁর টার্ন আর ডজগুলো শুধু এথলেটিক নয় বরং ব্যালে ড্যান্সের মতো ছিলো। তিনি যেভাবে দুইজন প্লেয়ারের ফাঁক দিয়ে বল নিয়ে ঢুকে যেতেন সেটিকে বর্ণনা করার মতো ভাষা আমার নেই। তাঁর খেলা দেখাটা সবসময়ই ছিলো আনন্দদায়ক, এমনি তাঁর বিরুদ্ধে খেলতে নামলেও তাঁর খেলাটাকে দারুণভাবে উপভোগ করতাম আমি। সমস্ত ক্যারিয়ারে আমি জিদানের বিরুদ্ধে অনেকগুলো ম্যাচ খেলেছি। এরকম ভাবে একজন প্লেয়ারের বিরুদ্ধে অনেকবার খেললে আপনি তাঁকে আটকাবার রাস্তা হয়তো বের করে ফেলবেন। কিন্তু সেই প্রথম ম্যাচ থেকে শেষ ম্যাচ পর্যন্ত জিদান নানা রাস্তা খুঁজে আমাকে মাঠে বোকা বানিয়ে ছেড়েছেন। রোনালদোর মতো আপনি জিদানকে আটকাবার জন্য শুধু প্রস্তুত হতে পারবেন কিন্তু পুরোপুরি সফল হতে পারবেন না।

আমি কঠোর পরিশ্রম করেছি জিদানকে থামানোর জন্য। নিজের সাধ্যের মধ্যে যতটুকু পারা যায় তাঁর লিমিটকে কমানোর চেষ্টা করেছি। ২০০৬ সালে আমরা ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ফাইনাল ম্যাচ খেলছিলাম। আর জিদান সেটায় প্রথম গোল করেছিলো। যদিও সেটা পেনাল্টিতে গোল ছিলো, কিন্তু জিদান সারা ম্যাচজুড়ে আমাদের ডিফেন্স লাইনকে পুরো নাচিয়ে ছেড়েছেন। ম্যাচ শুরুর মাত্র পাঁচ মিনিটের মাথায় জিদান একটা চিপ করে বল গোলবারের দিকে নিশানা করেছিলো। ভাগ্য ভালো সেটা গোলপোস্টে লেগেছিলো। আমরা দারুণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ক্যাপ্টেন হিসেবে আমি সেই চিপ ইনের পরপরই ডিফেন্স লাইনের সবাইকে আরো বেশি মনোযোগ দিতে বলছিলাম। কিন্তু জিদানের করার আরো অনেক কিছু বাকি ছিলো। জিদান আপনার ডিফেন্স লাইন ভেদ না করেও অবিশ্বাস্য অনেক কিছু করে দেখাতে পারতো।

আপনি মাঠে সবসময় তাঁর উপস্থিতি অনুভব করবেন। তাঁর প্রগাড়তা আর সৃজনশীলতা যেনো ঠিকরে ঠিকরে বল থেকে বের হয়। মাঠে তিনি মেজাজ হারানোর আগ পর্যন্তও এসবই করে দেখিয়েছিলেন। তাঁর পরই ঘটলো অনাকাঙ্ক্ষিত সেসব ঘটনা। কিন্তু সেদিনই আমি নতুন একটি শিক্ষা পেয়েছি – মাঠে নিজের নেতৃত্ব। আমি জানতাম আমার কাজ শুধু বল আটকানো কিংবা মিডফিল্ডার বা ডিফেন্ডার পজিশন ঠিক করে দেয়া নয়, বরং সবাইকে এক সুতোয় মনোযোগ ধরে রাখানোর কাজটা আপনাকেই করতে হবে। এমনকি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেই ম্যাচে। আমি মাঠে সবাইকে সেদিন বলেছিলাম, “আমরা অবশ্যই এটা করতে পারবো। এই ম্যাচটা হবে আমাদের।” সৌভাগ্যবশত জিদানের গোলের ঠিক দশ মিনিট পর মাতেরাজ্জি হেড থেকে গোল করে আমাদেরকে সমতায় ফেরায়।

এসময় আপনারা একটু নির্ভার হতেই পারেন, ঠিক যেমনটা আমরা তখন হয়েছিলাম। পেনাল্টিতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা নির্ভারভাবেই ডিফেন্স লাইনটাকে সামলেছি। কিন্তু টাইব্রেকারে প্রত্যেকবার যখন কেউ কিক করতে আগাতো আমার হার্টবিট যেনো বন্ধ হয়ে যেতো। যখন ফ্যাবিও গ্রোসো আমাদের বিজয় নিশ্চিত করলো আমি তখন কিছু শুনতে পারছিলাম না। চারপাশের সবকিছু যেনো অবিশ্বাস্য ঠেকছিলো আমার কাছে। Campioni del mondo! সেদিন ফাইনাল শেষে আমি ট্রফিটার চেয়েও বেশি কিছু পেয়েছিলাম। সেদিন বুঝেছিলাম দলে আমার কাজ কি। আর সেটা ছিলো ইটালির রক্ষণ দূর্গকে রক্ষা করা। আপনাকে মাঠে সবাইকে একসাথে নিয়েই খেলতে হবে। আর পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে আমরা একটা দল হিসেবে খেলেছিলাম। এবং আমরাই ছিলাম সেরা। কিন্তু শুধু ডিফেন্সেই নয়।

তো যেমনটা আমি বলছিলাম, ইটালিয়ান ফুটবলের ব্যাপার আসলেই সবার মাথায় সর্বপ্রথম আসে ইটালিয়ান ডিফেন্সের কথা। কিন্তু এটা আসলে ঠিক নয়। আমাদের অনেক গ্রেট স্ট্রাইকার আছেন। এমনকি আমাদের অনেক গ্রেট মিডফিল্ডারও আছেন। হ্যাঁ আমি জানি অনেকেই মনে করে শুধু ডিফেন্সের কারণেই আমরা ২০০৬ এর বিশ্বকাপ জিতেছি। আমরা সবাইকে হারিয়েই টুর্নামেন্টটি জিতেছি। ডিফেন্সে আমাদের কাজটুকু আমরা করেছি। কিন্তু আমরা যদি গোল করতে না পারতাম তাহলে একটা ম্যাচও জিততে পারতাম না।

এজন্য মনে হয় আমাদের ফ্রন্টলাইন তাঁদের যোগ্য প্রশংসাটা খুব কমই পায়। অবশ্যই আমি পিরলো এবং টট্টির সাথে ইটালিয়ান টিমে খেলতে খুব পছন্দ করতাম, কিন্তু ক্লাব ফুটবলে এই দুইজনের মুখোমুখি হওয়াটাও ছিলো আমার জন্য ‘সুখকর’ এক চ্যালেঞ্জ। টট্টি ফরোয়ার্ড হওয়ায় যখন আমি টট্টির বিরুদ্ধে খেলতাম তখন মাঠে আমরা একে অপরের সাথে কথা বলার অনেক সুযোগ পেতাম। যখন আমাদের গোলকিপার কোনো একটা গোলকিক নিতে যাবে তখন আমি আর টট্টি মিলে মজা করতাম। এটা আমাদের জন্য খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার ছিলো। সে খুব মজার মানুষ।

কিন্তু পিরলো? সে ছিল একেবারে ভিন্ন ধাঁচের। তাঁর পায়ে বল থাকলে আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না সে বলটা দিয়ে কি করবে। সে বিপক্ষ দলের হয়ে মিডফিল্ড দাপিয়ে বেড়ানোর সময় আমার সবসময় চেষ্টা থাকতো তাঁর পাস গুলোকে ব্লক করার। বিপক্ষ দলের হয়ে খেলার সময়েও আমাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কাজ করতো। মাঠে আমরা একে অপরের কাজটা আরো কঠিন করে তুলতাম।

আমি জানি তাঁরা আমার ভুলের সুযোগ নিয়ে যেকোনো মুহূর্তে গোল করে বসতে পারে, এমনি তাঁরাও জানে যে আমিও যেকোনো মুহূর্তে তাঁদেরকে ট্যাকেল করতে বিন্দুমাত্র পিছপা হবো না। মাঠে আপনার মতো একই জার্সিধারী দশজনই তখন শুধু আপনার বন্ধু। এছাড়া অন্য সব বন্ধুত্ব আপনাকে মাঠের বাইরে ফেলে আসতে হবে। ম্যাচের আগে কিংবা পরে আমরা হয়তো একসাথে ডিনার করেছি, কিন্তু একে অপরের বিরুদ্ধে খেলার সময় সেগুলো কোনো প্রভাব ফেলেনি। ইটালির হয়ে আমরা যতোগুলো ট্রফি জিতেছি সেগুলো এখনো একইভাবে ক্যাবিনেটে সাজানো আছে। কিন্তু মাঠে আমার কাজ হলো আমার ভালো বন্ধুকে গোল করা থেকে ঠেকানো।

স্পেনকে এককথায় বললে বলা যায় এক কঠিন জগত। রিয়াল মাদ্রিদের সাথে ২০০৬ সালে আমি যখন চুক্তিবদ্ধ হই সেবারই আমি প্রথম ইটালির বাইরে খেলতে যাই। এর আগে নাপোলি, পার্মা, ইন্টার আর জুভেন্টাসেই আমার ক্যারিয়ার কেটেছে। নতুন এক শহর, নতুন টিমমেটদের সাথে মানিয়ে নেওয়াটাও সহজ ছিলো না। সম্ভবত মাদ্রিদেই আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং সময়টা কেটেছে। ইটালির চেয়ে স্পেনে একটা ম্যাচের জন্য প্রস্তুত হওয়াটা বেশ কষ্টসাধ্যই ছিলো।

কঠোর নিয়মের মধ্যে থেকে লাগাতার ট্রেনিং করতে হতো, আর কোচরাও ছিলেন নিরলস মানুষ। ভাগ্য ভালো সেসময় আমাদের ম্যানেজার ফ্যাবিও ক্যাপেলো রিয়াল মাদ্রিদকে কিছুটা ইটালিয়ান ধাঁচের ফুটবল খেলাতেন। তাই আমার জন্য মানিয়ে নেয়াটা বেশি কষ্টকর হয়নি। যদি ক্যাপেলো কোনোদিন বলতেন আগামীকাল সকাল দশটায় ট্রেনিং, তাহলে দশটা মানে দশটাই। এক মিনিটও এদিক-সেদিক নয়। তিনি আমাকে মাদ্রিদে মানিয়ে নিতে অনেক সাহায্য করেছিলেন। মাদ্রিদে এসে আমি শিখেছি কিভাবে নিজেকে ইন্ডিভিজুয়ালি আরো পরিণত করা যায়। আমার সামর্থ্যের কারণেই আমি তখন বিশ্বের সেরা ক্লাবে সুযোগ পেয়েছিলাম, আর আমার প্রতি মানুষের আশাও ছিলো অনেক বেশি।

আমি আমাদের নতুন ব্যাকলাইনের টিমমেটদের সাথেও নতুন নতুন অনেক কিছু শিখেছিলাম। আমার প্রথমদিকের ট্রেনিং সেশনের একটা ঘটনা মনে আছে। আমি সার্জিও রামোসকে একটা পাস দিলাম। সার্জিও সাথে সাথে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “কি ব্যাপার তুমি ভুল পাস দিলে কেনো?” “কই ভুল করলাম? আমি তো তোমাকে বলটা পাস করলাম।” সবকিছুই নতুন ছিলো। ইটালিতে আপনাকে স্পেস খুঁজে সেদিকে পাস দিতে হতো। কিন্তু স্পেনে বলটা সরাসরি প্লেয়ারদের পায়ে পাস দিতে হয়। “নাহ তোমাকে আরো জোরে পাস দিতে হবে। একদম আমার পা বরাবর।”

আমার অনেক কিছু শেখার ছিলো, কিন্তু যখন আমি মাদ্রিদে যাই তখন আমি আর ২১ বছরের যুবক নই। আমি তখন মাত্রই বিশ্বকাপ জিতেছি। আত্মবিশ্বাসে টগবগ করছি। একজন যুবকের মতো সেভাবে পাস দেওয়াটা আমার পক্ষে কষ্টকর ছিলো। কিন্তু ২০০৬ এ ইটালির হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের পর আমি খেলাটাকে খুব ভালোভাবেই বুঝতাম। রিয়াল মাদ্রিদে আমরা টানা দুই সিজনই লা লীগা জিতেছিলাম। একবার রিয়াল মাদ্রিদের জার্সি পড়লে আপনি চিরদিনের জন্য সেই ক্লাবের অংশ হয়ে যাবেন।

আমার ক্যারিয়ারে এমন অনেক ম্যাচ খেলেছি যেসব ম্যাচ খেলার পর আমার মনে হয়েছে আমি আমার সবটুকু দিয়ে মাঠে খেলেছি। কিন্তু আমার রিটায়ারের পর কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করার পর উপলব্ধি করতে পারলাম – মাঠের নব্বই মিনিটের সাথে একজন ম্যানেজারের জীবন তুলনা করা যায় না। ফুটবলের একদম নতুন একটা বিষয় সম্পর্কে আমি প্রতিনিয়ত শিখছি। তিয়ানজিন কুয়ানজিয়ানের হয়ে আমরা এখন চাইনিজ সুপার লীগে খেলি। ম্যানেজার হিসেবে প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহে আমার প্লেয়ারদেরকে সবটুকু উজাড় করে দিতে হয়।

আমাকে প্লেয়ারদের পারিবারিক সমস্যা কিংবা তাদের ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে কাজ করতে হয়। তাদেরকে উৎসাহ দিতে হয়। একজন চায়নিজ অনুবাদককে সাথে নিয়ে ২৫ জন প্লেয়ারের জন্য এ কাজ আমাকে প্রতিনিয়ত করতে হয়। ভাষাগত সমস্যার কারণে আমি তাদেরকে কোনো কিছু বুঝাতে না পারলে মাঝে মাঝে আমি নিজেই ট্রেনিংয়ে নেমে হাতে-কলমে তাদেরকে দেখাই। ম্যানেজার হিসেবে সেখানে কাজ করাটা খুব সোজা নয়। আপনার নিজের অভিজ্ঞতাগুলোকে তাদের সাথে শেয়ার করতে হয়।

আমার পুরো ক্যারিয়ারজুড়ে আমি লিপ্পি, ত্রাপাট্টোনি, মালদিনি, ক্যাপেলোর মতো কোচদের অধীনে খেলেছি। সারা ক্যারিয়ারজুড়ে তারা আমাকে যে উপদেশ দিয়েছেন সেগুলোকে আমি এক ছোট্ট নোটবুকে টুকে রেখেছি। খেলোয়াড়ি জীবনের কোনো ভুল কিংবা সাফল্য আমি সেই নোটবুকে লিখে রেখেছি। চায়নাতে নোটবুকটা সবসময় আমার সাথেই থাকে যাতে আমি একিই ভুল আবার না করি। গত সামারে আমি যখন তিয়ানজিন কুয়ানজিয়ানের দায়িত্ব নিই, তখন তারা মাত্র দ্বিতীয় বিভাগে খেলে। টানা সাতটি ম্যাচ হেরে তখন দ্বিতীয় বিভাগের ১৬ দলের মধ্যে অষ্টম তারা। কিন্তু আমার মধ্যে তখনও সেই আত্মবিশ্বাসটা ছিলো।

এসবই আমি পেয়েছিলাম আমার কোচ আর টিমমেটদের কাছ থেকে। একটা লীগ শিরোপা কিংবা বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার অনুভূতি তখনো আমার মধ্যে তাজা ছিলো। আমি খেলাটাকে ভালোবেসে কাজে নেমে পড়েছিলাম। সিজন শেষে আমাদের দল টপ অফ দ্যা টেবিল হয়েছিলো। প্রমোটেড হয়ে আমরা এই সিজনে চাইনিজ সুপার লীগ খেলার সুযোগ পেয়েছি। যে মুহূর্তে দ্বিতীয় বিভাগ থেকে আমাদের দল প্রমোশন পেলো তখন আমি আমার মাথার মধ্যে মারতেল্লিনির কোনো চিৎকার শুনতে পাইনি।

প্রমোশন কোনো ট্রফি হতে পারে না, কিংবা কোনো ম্যাচ জেতানো গোল বা ট্যকেলও নয়। কিন্তু নিজ দলের প্লেয়ারদেরকে সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য এই প্রমোশন আসলেই অনেক বড় কিছু। ছোট বালক হিসেবে মাঠে বল-বয়ের কাজ শুরু করার সময় থেকেই আমি নিজের মধ্যকার আত্মবিশ্বাসের খোঁজে ছিলাম, যেটার পূর্ণতা আমি পেয়েছি একিই বছরে বিশ্বকাপ এবং ব্যালন ডি’অর পাওয়ার মাধ্যমে।

আর এখন আমি এক নতুন আত্মবিশ্বাসের খোঁজে আছি। নাহ ডিফেন্স লাইনের কোনো লিডার হিসেবে নয়, বরং সাইডলাইনের একজন ম্যানেজার হিসেবে।

তথ্যসূত্র ও ছবি: এগিয়েচলো

আরো পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.