ইউটিউবে প্রথম ভিডিওটি আপলোড হয়েছিল আজকের দিনে!

0

বন্ধুত্ব করার জন্য ফেসবুক, কিছু জানতে চাইলে গুগল, আর আনলিমিটেড ভিডিও দেখতে চাইলে ইউটিউব—মোটা দাগে আজকাল আমাদের অনলাইন জগতটা ঘুরপাক খাচ্ছে এই চক্রেই! তবে গত কয়েকবছরের ভেতরের ফেসবুকের পরেই সবচেয়ে বেশি যে মাধ্যমটি আমাদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে সেটি হচ্ছে ইউটিউব।

প্রতি মুহুর্তে অজস্র, অসংখ্য ভিডিও আপলোড হচ্ছে এই সাইটটিতে, পৃথিবীজুড়ে অসংখ্য মানুষ কোটি কোটিবার দেখছে সেই ভিডিওগুলো। ইউটিউবে এখন কত হাজার ভিডিও আছে কেউ জানেন? অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এই তথ্য জানা এখন খুবই কঠিন। কারণ আজ ইউটিউবে প্রতি সেকেন্ডে ইউটিউবে আপলোড হচ্ছে প্রায় দেড় ঘণ্টার সমপরিমাণ ভিডিও। আর একটু বড় করে বললে প্রতি মিনিটে প্রায় ১০০ ঘণ্টা অথবা প্রতি ঘণ্টায় ২৫০ দিনের সমপরিমাণ! বছর শেষে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৮ শতাব্দীকাল! স্রেফ ভাবুন তো! এক সেকেন্ডে সারা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে ইউটিউবে আপ হচ্ছে দেড় ঘন্টারও বেশি ভিডিও, এক মিনিটে আপ হচ্ছে ১০০ ঘন্টারও বেশি ভিডিও! সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপারটি হচ্ছে প্রতি মুহুর্তেই বাড়ছে এ সংখ্যাটা। সংখ্যার হিসাবে এ এক বিশাল বিস্তৃত মহাসমুদ্র। অথচ আজ থেকে মাত্র ১৩ বছর আগে ২০০৫ সালের আজকের দিনে, অর্থাৎ ২৩শে এপ্রিল ইউটিউবের অন্যতম সহপ্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জাওয়েদ করিম যখন ইউটিউবের প্রথম ভিডিওটি আপলোড করেছিলেন, কেই বা ভাবতে পেরেছিল যে এতো অল্প সময়ের ভেতর পৃথিবীর ইতিহাসে এতো গুরুত্বপূর্ণ এক জায়গা দখল করে নেবে এই ভিডিও শেয়ারিং সাইটটি?

ইউটিউবের দশম বর্ষপূর্তিতে ইউটিউব থেকে শেয়ার করেছিল ইউটিউবে আপলোড করা সর্ব প্রথম ভিডিওটি। ইউটিউবের প্রথম ভিডিওটি ছিল মাত্র ১৮ সেকেন্ডের। যেটি তৈরি করেছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সহপ্রতিষ্ঠাতা জাওয়েদ করিম। ভিডিওর নাম ছিল ‘মি অ্যাট দ্য জু’। ভিডিওটি জাভেদ করিম ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগোর চিড়িয়াখানায় তৈরি করেছিলেন। ২০০৫ সালে ২৩ এপ্রিল ভিডিওটি আপলোড করা হয়। জাওয়েদ এটি আপ করেছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় রাত ৮টা ২৭ মিনিটে। ঢাকার স্থানীয় সময় তখন ২৪ এপ্রিল সকাল ৯টা ২৭ মিনিট। ভিডিওটি মূলত ছিল সান ডিয়েগোর একটি চিড়িয়াখানার বিবরণ। জাওয়েদ ক্যামেরার সামনে এসে জানাচ্ছিলেন হাতি দেখার সংক্ষিপ্ত বিবরণ। চিড়িয়াখানার একপাল হাতি সামনের দাঁড়িয়ে হাতিদের সবচেয়ে ‘কুল’ ব্যাপারটা কী সেটা নিয়ে বেশ ভেবেচিন্তে করিমের মন্তব্য ছিল, “তাদের অনেক লম্বা… হুমমম… শূর আছে।”

কি অদ্ভুত লাগছে না শুনতে? জাওয়েদ কি নিজেও তখনো জানতেন যে কি অবিস্মরণীয় এক ইতিহাসের অংশ হতে চলেছে তার তৈরি এই ভিডিও? তার এই হাতি দেখার অনুভূতিটুকুন! মাত্র ১৮ সেকেন্ডের এ ভিডিওটি কতবার দেখা হয়েছে জানেন? মাত্র তিন বছরের মাথায় প্রায় ৫ কোটি বার দেখা হয়েছে ভিডিওটা, এমনকি আজো ইউটিউবে আগ্রহী হয়ে উঠা ইউজাররা খুঁজেছেন ইতিহাস সৃষ্টিকারী ইউটিউবের প্রথম এই ভিডিওটি, সেখানে কমেন্ট করেছেন, অভিনন্দন জানিয়েছেন জাওয়েদ ও তার এই অসামান্য সৃষ্টিকে।

অথচ ইউটিউবের যাত্রা হয়েছিল এর তিন প্রতিষ্ঠাতার চাকরী চলে যাওয়ার কারণে! চাঁদ হার্লে, স্টিভেন চ্যান ও জাভেদ করিম। এই তিন বন্ধু ছিলেন অর্থ আদান-প্রদানের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান পেপ্যালের কর্মী। একসাথেই থাকতেন তারা, কাজ আর নিজেদের প্ল্যানিং শেয়ারিং চলত একসঙ্গেই। তবে ঝামেলা বাধল কিছুদিন পর। পেপ্যালের মালিক প্রতিষ্ঠানকে বিক্রি করে দিলেন অনলাইনে নিলাম ওয়েবসাইট ইবের কাছে। চাকরি গেল অনেক কর্মীর। সঙ্গে চাদ হার্লে, স্টিভেন চ্যান ও জাভেদ করিমেরও।

চাকরী হারিয়ে তিন বন্ধু কিছুটা হতাশ হলেও তাদের উদ্ভাবনী শক্তি তাদের হাল ছাড়তে দিল না। অনেকদিন ধরেই তারা ভাবছিলেন একেবারেই নিজেদের মতন নতুন কিছু একটা শুরু করবেন। এই চাকুরীচ্যুতি যেন তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এল। তাদের মাথায় ঘুরতে থাকা অনলাইনে ভিডিও শেয়ারিং ওয়েব শুরু করার আইডিয়াটা নিয়ে এরপর তিনজনেই কাজ জোরেশোরে কাজ শুরু করলেন। ব্যস, শুরু হলো ইউটিউবের যাত্রা। ২০০৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষামূলক চালু করার পর আনুষ্ঠানিকভাবে সবার জন্য উন্মুক্ত হয় দুই মাস পর। মে থেকে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য খুলে দেওয়া হলো ইউটিউব। এ দু’মাস নিজেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। প্রতিষ্ঠাতাদের ভাবনায় শুরুটা ছিল স্রেফ মজা। বিনোদন এবং শেয়ারিং। তাই নিজেদের সামান্য অর্থ দিয়েই শুরু হয়েছিল বিশাল এই প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু এটা যখন ধীরে ধীরে সবার মাঝে ছড়াতে লাগলো, তখন বিপুল পরিমাণ ইউজার আসতে লাগল সাইটে। এগিয়ে এলো একটা বড় কোম্পানি। সেকুয়া ক্যাপিটাল নামের ওই কোম্পানি সে বছরই নভেম্বর মাসে ইউটিউবে বিনিয়োগ করলেন ৩৫ লাখ মার্কিন ডলার। সাইটের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগও বাড়ে। পরের বছর এপ্রিল মাসে আরও ৮০ লাখ ডলার যোগ হয় ইউটিউবের একাউন্টে। এরপরেই এল ২০০৬ সালের সেই মোড় ঘোরানো মুহুর্ত। ২০০৬ সালের নভেম্বরে গুগল তার সেবাভিত্তিক বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে ১.৬৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কিনে নেয় তখন পর্যন্ত মাত্র দেড় বছর বয়সী ভিডিও শেয়ারিং সাইট ইউটিউব।

আর আজ অ্যালেক্সা রেটিং অনুযায়ী পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভিজিট করা ওয়েবসাইটের তালিকায় ইউটিউবের অবস্থান তৃতীয়। ইউটিউবের উপরে থাকা দুটি ওয়েবসাইট যথাক্রমে ফেসবুক ও গুগল। তবে মজার ব্যাপার ইউটিউব কোনো সার্চ ইঞ্জিন না হওয়া সত্ত্বেও এখানে যতবেশি ‘সার্চ’ করা হয়ে থাকে তা বিং, আস্কডটকম ও ইয়াহুর মতো সার্চ ইঞ্জিনগুলোর মিলিত সার্চের চাইতে অনেক বেশি। সার্চের পরিমাণ হিসাব করলে গুগলের পরই ইউটিউবের অবস্থান।
ভাবা যায়! ইউটিউবের ১০০ কোটি অর্থাৎ এক বিলিয়ন ভিউয়ের রেকর্ড সর্বপ্রথম ভেঙ্গে দেয় কোরিয়ান গায়ক সাইয়ের গ্যাংনাম স্টাইল গানটি। প্রথম দুই বিলিয়ন ভুই পাওয়া গানও এটাই। কিন্তু এরপরেই ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস মুভি সিরিজের অভিনেতা পল ওয়াকারের স্মরণে তৈরি ওয়াইজ খলিফা ও চার্লি পুথের গাওয়া সি ইউ এগেইন গানটী ছাড়িয়ে যায় গ্যাংনাম স্টাইলের রেকর্ড। প্রথমবারের মত পেরিয়ে যায় ৩ বিলিয়ন ভিউয়ের রেকর্ড। কিন্তু এরপরেই শুরু দেসপাতিসোর রাজত্ব। প্রথম গান হিসেবে পুয়ের্তো রিকোর শিল্পী লুইস ফনসি ও ড্যাডি ইয়াংকির গাওয়া এবং অসামান্য দৃশ্যায়ণে তৈরি এই গানটি প্রথমবারের মত পেরিয়েছে ৫০০ কোটি বা ৫ বিলিয়ন ভিউয়ের মাইলফলক। এমনকি এই অসাধারণ গানটির চিত্রায়ণে মুগ্ধ হয়ে অর্থনীতিগতভাবে জর্জরিত হয়ে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া পুয়ের্তো রিকোতে ঢল নেমেছে পর্যটকদের, আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে পুয়ের্তো রিকোর অর্থনীতি! একটা গানের কি অসামান্য ক্ষমতা! আর কিভাবে একটা ভিডিও শেয়ারিং সাইট হয়ে ইউটিউব পাল্টে দিচ্ছে পুরো একটা দেশের অর্থনীতিই!

অসামান্য এই অর্জনের পেছনে থাকা অন্যতম কুশলী জাওয়েদ করিম ২০০৭ সালের ১৩ মে ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেয়ার বিরল সম্মান অর্জন করেন। সেখানে চমৎকার এক অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তব্য দেন তিনি। তরুণপ্রজন্মকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন,

‘অনেকে খেয়াল করেছো, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ডিগ্রী প্রদান অনুষ্ঠানে যেসব বক্তা আসেন, তাদের মধ্যে আমি সর্বকনিষ্ঠ। এর ভালো-মন্দ দুটো দিকই আছে। খারাপ দিক হলো, বয়সের কারণে আমি তোমাদের জীবন সম্পর্কে গভীর কোনো দর্শনের ধারণা দিতে পারব না। না পারার কারণ হিসেবে বলা যায়, আমি নিজেই সেই ধারণা খুঁজে বেড়াচ্ছি। ভাল দিক হলো তোমরা এবং আমি বয়সে একই প্রজন্মের। তার মানে দাঁড়ায়, আমি যে সুযোগ পেয়েছি, যা শিখতে পেরেছি, তা এখনও প্রয়োগ করার সুযোগ আছে। তিন বছর আগে আমি যে সুযোগ পেয়েছি, যেসব ধারণা প্রয়োগ করেছি, তা তোমরা এখনও একইভাবে প্রয়োগ করার সুযোগ ও সময় পাবে। এই উদ্যমের কারণেই প্রতিষ্ঠার ১৮ মাসের মধ্যেই আমাদের ওয়েবসাইট নিয়ে আমরা আলোচিত হই। সাধারণ মানুষের কাছে আমরা খবরের শিরোনাম হই। তাদের অনেকের জিজ্ঞাসা ছিল, এ ধরনের আইডিয়া আমরা কোথা থেকে পেলাম। আমি তাদের সব সময় একটাই কথা বলি, চারদিকে সব সময়ই তরুণ মেধাবী মানুষ থাকে, খুঁজে বের করতে হয় তাদের। তোমরা যখন এই হল থেকে বের হয়ে যাবে, তখন একটা কথাই মনে রাখবে। পৃথিবী তোমার জন্য অপেক্ষা করছে নতুন কোন বড় উদ্যোগ সুযোগ সৃষ্টির জন্য। তাই ঝুঁকি নাও, সফল হও।’

কি অদ্ভুত সুন্দর প্রেরণাদায়ী না কথাগুলো? এভাবেই ইউটিউব প্রতিমুহুর্তে ছাড়িয়ে যাচ্ছে নিজেকে, সৃষ্টি করছে নতুন কিছু করার উদাহরণ। “মি অ্যাট দ্য জু” শিরোনামে আজ থেকে ১৩ বছর আগে আপলোড হওয়া সেই ভিডিওটা আজ পথপ্রদর্শক হয়ে আছে অসামান্য সব অর্জনের, এভাবেই ইউটিউব পেরিয়ে যাক একের পর এক মাইলফলক, অনুপ্রানিত করুক তরুণদের ঝুঁকি নিতে, নতুন কিছু শুরু করতে, পৃথিবীকে পাল্টে দিতে! আর বারবার অবাক হয়ে ভাববো আমরা, ভাগ্যিস, সেদিন পেপ্যালের চাকরীটা চলে গিয়েছিল এই অসাধারণ তিন তরুণের! নাহলে যে ইউটিউবের জন্মই হত না! তথ্যসূত্র: এগিয়েচলো

আরো পড়ুন

SHARE

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.